Friday, January 22, 2021

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে যখন বাংলাদেশ অঞ্চলে খরচে পোষায় না বলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীলের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়, তখন কীভাবে পাট সেই স্থান দখল করল, সে এক বিচিত্র কাহিনী, পড়েছিলাম অনেক দিন আগে ইংরেজ আমলের সরকারের পাট-সম্পর্কিত একটি রিপোর্টে (সম্ভবত ফাউকাস কমিটি)। কাহিনীটা মোটামুটি নিম্নরূপ। নীলের বাজার খতম হওয়ায় বাংলাদেশের ইংরেজ কোম্পানি কর্মচারীদের বেকার হয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়। বিলেত থেকে তাদের মালিকরা জানিয়ে দিল, দেশে ফিরলে কাজের সুবিধা নেই এবং ওই দেশের নতুন কোনো রফতানির সম্ভাবনা পরীক্ষা করতে হবে। ডান্ডিতে তখন জাহাজের দড়ি প্রস্তুতের শিল্প ছিল, ফ্লেক্স ও হেম্পের প্রস্তুত ক্যাপস্ট্যানের দড়ি তারা ইউরোপে রফতানি করত। কাঁচামাল আসত আমেরিকার সদ্য হারানো উপনিবেশ অঞ্চল থেকে। পরে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ফলে সেই শিল্পে বেশি করে কাঁচামালের সংকট দেখা দেয়। বাংলায় দড়ির জন্য হেম্পের কোনো বিকল্প আঁশ পাওয়া যায় কিনা, অনুসন্ধান করতে বলা হলো তাদের। বাংলার পল্লীতে তখন চাষীরা নিজেদের প্রয়োজনে বাড়ির আশেপাশে সামান্য পাট চাষ করতেন, তা থেকে বাড়িতেই তাঁতে কিছু চট ও গৃহস্থালির কাজের জন্য দড়ি প্রস্তুত করতেন। দায়ে পড়ে কোম্পানির লোকেরা এ পাট কিছু তাদের পরীক্ষা খামারে (যেটাকে এখন কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেন বলা হয়) যত্ন-সহকারে উত্পন্ন করে জাহাজে ১০০ মণের এক চালান ১৭৯১ সালের দিকে ডান্ডিতে পাঠায় এবং লিখে দেয়, নমুনায় দেয়া এ পাট এতদ্দেশে স্বল্প ব্যয়ে প্রচুর উৎপাদন সম্ভব। খুব চেষ্টা করুন, যাতে এটা কাঁচামাল হিসেবে স্বদেশের শিল্পে ব্যবহার করা যায়। ডান্ডিতে সেই পাট দিয়ে প্রথমে জাহাজের দড়ি তৈরির জন্যই চেষ্টা করা হয়। কিন্তু দেখা গেল হেম্প বা ফ্লেক্সের মতো পাটকে দড়ির জন্য ব্যবহার করা যাচ্ছে না— এত মজবুত হতে পারে না। শেষে হতাশ না হয়ে তারা পাট থেকে কিছু চটের থলে তৈরি করে ইউরোপে তাদের দড়ির চালানের সঙ্গে বিনামূল্যে নমুনা হিসেবে পাঠিয়ে লিখে দেয়, এ নতুন ধরনের কাপড় সস্তায় দেয়া সম্ভব যদি চাহিদা থাকে।

ইংরেজ কোম্পানির প্রচেষ্টা ও ঐকান্তিকতার ফলে পাটের দ্বারা বোনা চটের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেল। বঙ্গদেশে কোম্পানির লোকদের বেকারত্ব ঘুচল। ১৮২৮ সালে প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এ দেশ থেকে পাট রফতানি শুরু হয়। প্যাকিংয়ের উপাদান হিসেবে পাটজাত দ্রব্যের বাজার সৃষ্টি করতে ইংরেজদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হয় কিন্তু এর দ্বারা পূর্ববঙ্গের অর্থনীতিতে সচ্ছলতা আসে। ১৮৭০ সালে এক মণ চালের দাম ছিল ১ দশমিক ৩৭ টাকা এবং গড়ে এক মণ ভালো পাটের দাম ছিল ৪ দশমিক ৭৫ টাকা। পাট উৎপাদন ব্যয় চাল উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় (১৯৪৫ সালের তথ্যে) প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। সুতরাং সেকালে লাভের আশাতেই চাষীরা পাট চাষ করেছেন। নীলের মতো কোনো জবরদস্তি করতে হয়নি। বর্তমান শতাব্দীর শুরুতে (১৯০০-১৯০৯) পাটের মূল্য গড়ে ৪ টাকা ১ আনা হয়। মহামন্দার আগে (১৯২৫-২৯) পাটের মূল্য হয় গড়ে মণপ্রতি ১০ টাকা ৪ আনা। এটাই ছিল পাটের স্বর্ণযুগ এবং ১৯২৬-২৭ সালে প্রায় ৮০ কোটি টাকার পাট রফতানি হয়, যা ছিল বঙ্গদেশ থেকে ওই বছরের মোট রফতানি মূল্যের ৬২ শতাংশ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যখন ইংরেজদের ভারত ছাড়তে হলো, তখন পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে যে স্বাধীন বাংলার সীমানা নির্ধারিত হলো, তাতে বর্তমান বাংলাদেশের ভাগে দেয়া হয় সবটুকু ভালো পাটের জমি আর ভারতের ভাগে দেয়া হয় পশ্চিমবঙ্গের সবগুলো পাটকল। অচিরেই আমরা এ দেশে নতুন করে পাটজাত দ্রব্যের শিল্পোৎপাদন শুরু করি, কিন্তু কাঁচা পাটের একটি বড় অংশ তবু আমাদের রফতানি করতে হচ্ছে। গরজে পড়ে ভারত কাঁচা পাটের চাষ বৃদ্ধি করে। যখন থেকে বাণিজ্যিক হারে এ অঞ্চলে পাট চাষ শুরু হয়, তখন থেকেই পাটের কতগুলো সমস্যাও চিহ্নিত হয়ে এসেছে। প্রথমত. পাট এ অঞ্চলে উত্পন্ন এমন একটি বস্তু, যা বিদেশী মুদ্রা অর্জন করে আসছে। তাই ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালে এ দেশের মানুষকে বলা হয়েছে, আমাদের এই সোনালি আঁশের অর্থ অন্যেরা শোষণ করতে পারে বা করছে। স্বাধীনতা পেলে পাটের লাভটা পুরোমাত্রায় স্বদেশে রাখা যাবে। যুক্তিটা সাধারণভাবেই এ দেশের মানুষ বিশ্বাস করে এসেছে। সুতরাং পাটের সঙ্গে আমাদের জাতীয়তাবোধ ঐতিহাসিকভাবেই সম্পর্কিত। পাটের অর্থনীতির সঙ্গে উচ্ছ্বাসও জড়িত হয়েছে।

দ্বিতীয়ত. একটি বাণিজ্যিক সামগ্রী হিসেবে পাটের দাম চিরকালই অপ্রত্যাশিতভাবে বছর বছর ওঠানামা করে, যাতে চাষী ও পাট শিল্পের মালিকরা কেউই স্বস্তি অনুভব করতে পারেননি। সরকার পাটের মূল্য স্থিতিশীল করার জন্য গত এক শতাব্দীতে হেন কাজ নেই, যা করেনি। পাটের চাষ নিয়ন্ত্রণ, পাটের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, রফতানির নিয়ম ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ, সমবায় সমিতির মাধ্যমে পাট বিক্রয়ে উৎসাহদান, পাটের ফটকা বাজার স্থাপন এবং সময় সময় পুলিশ দিয়ে তা বন্ধ করে দেয়া, সরকারের নিজস্ব খাতে পাটের ব্যবসা ও পাট শিল্পের মালিকানা— এ সবই তার উদাহরণ। কিন্তু পাটের সমস্যার তাতে কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।

বিশ্বের ৩০টি রফতানিযোগ্য কাঁচামালের মধ্যে মূল্যের অধিক অস্থিরতার মাপে পাটের স্থান এখন ষষ্ঠ।

পাটের রাজনীতি

যেহেতু অসংখ্য ক্ষুদ্র পাটচাষী সারা দেশে পাট চাষ করেন, সুতরাং বিনা পরিশ্রমে শুধু কথা দিয়ে তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য এ দেশের ক্ষমতালোভীরা পাটের মূল্য নিয়ে এ দেশের রাজনৈতিক আসর জমানোর চেষ্টা করেছেন। সম্প্রতি (১৬-৯-৮৭) ঢাকার একটি দৈনিকের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘পাটচাষীরা প্রায় প্রতি বছরই তাদের উৎপাদিত পাট নিয়ে বেকায়দায় পড়েন। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি ও দৌরাত্ম্যের দরুন পাটের ন্যায্যমূল্য তারা পান না। পাটের বাজার থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের যতদূর সম্ভব নির্মূল করতে হবে।’ কেউ বলেছেন, ‘পাটের ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা বিধান করতে সরকার নারাজ।’ পাটের মূল্য যখন কিছুদিন আগে মণপ্রতি ২০০ টাকার নিচে চলে যায়, তখন একটি দলের পক্ষ থেকে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা দরে পাট কিনে নেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়। অনেকে বলেছেন, ‘পাটের বাজারের ওপর দেশী-বিদেশী একচেটিয়াবাদীদের কর্তৃত্ব স্থাপিত হওয়ার ফলে পাটচাষীকে পানির দরে পাট বিক্রি করতে হয়।’ যারা এসব মেঠো বক্তৃতা দিয়ে থাকেন, তারা ভালোই জানেন যে মধ্যস্বত্বভোগী না থাকলে পাট গ্রামাঞ্চল থেকে দেশে বিদেশে পাটকলের কাছে বিক্রয় করা কোনো চাষীর পক্ষেই সম্ভব নয়। তারা ভালোই জানেন যে হাজার হাজার মধ্যস্বত্বভোগী যখন নিজেদের মূলধন খাটিয়ে প্রতিযোগিতামূলকভাবে লাভের আশায় পাটের কেনাবেচা করেন, তখন তা একচেটিয়া ব্যবসায়ের সংজ্ঞায় পড়ে না। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পাটের ক্রেতা বা বিক্রেতা কারোরই একচেটিয়া ক্ষমতা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের মূল্য যেমন হ্রাস হয়, তেমনি কখনো কখনো তার বৃদ্ধি হয়। আর সেই হ্রাস-বৃদ্ধির আলোকেই আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা নিজেদের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেন। আন্তর্জাতিক মূল্যকে অস্বীকার করে সরকার যখন ভর্তুকি দিয়ে পাট কিনেছে, তখন সরকার ও করদাতার লোকসান ছাড়া তেমন কোনো ফায়দা হয়নি, বাজারের চাহিদাই আবার একদিন সমস্যার সমাধান এনে দিয়েছে। চাষীদের বোঝানো হয়, ডান্ডির বাজারে পাটের দাম কমেছে ২০ শতাংশ, অথচ বাংলাদেশের চাষীর জন্য মূল্য কমেছে ৩০ শতাংশ— আমাদের পাট ব্যবসায়ীদের শোষণটা দেখুন একবার। কিন্তু আসল কথাটা এই যে ডান্ডির ক্রেতা যখন পাটের দাম ১০০ টাকার বদলে ৮০ টাকা দিচ্ছে, তখন ক্রয়মূল্যের একটা মোটা অংশ হলো জাহাজ, গ্রেডিং, রেল, অফিস, গুদাম, কর্মচারীর বেতন ইত্যাদির খরচ (ধরা যাক ৪০ টাকা), যা পাটের দাম বাড়া বা কমার সঙ্গে বাড়ে-কমে না। পাটের দাম শেষ স্তরে ২০ টাকা কমলেও ওই ব্যয়টা ঠিকই থাকে। সুতরাং আগে যখন ডান্ডির দেয়া ১০০ টাকায় চাষীর ভাগ ছিল ৬০ টাকা, এখন ২০ টাকা মূল্য হ্রাসে তার প্রাপ্য কমে ৪০ টাকা হয়ে যাবে। তাই কোনো পক্ষের নষ্টামি ছাড়াই ডান্ডিতে ২০ শতাংশ মূল্য হ্রাস হলে সরিষাবাড়ীতে (উদাহরণস্বরূপ) মূল্য হ্রাস হবে ৩০ শতাংশ। বিপণনের ব্যয় বিশ্লেষণে অভিজ্ঞ লোকদের কাছে যা স্বাভাবিক, সেই তথ্যটাকেই নিরক্ষর চাষীকে অসন্তুষ্ট করার জন্য এমনভাবে বলা যায়, যাতে মনে হবে যে ব্যবসায়ীরা পাটচাষীর প্রাপ্য লুট করছেন। ফলে দেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেও বিপরীত চাল হিসেবে আসে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির আশ্বাস, সরকার থেকে পাট কেনার আশ্বাস এবং সমবায়ের মাধ্যমে শোষকশ্রেণীর বিনাশের আশ্বাস। আসলে কোনো চুক্তিই হয় না, ন্যায্যমূল্যে সামান্য পাট লোক দেখানোর জন্য কেনা হলেও সব পাট কেনার ক্ষমতা দরিদ্র দেশের কোনো সরকারের হয় না এবং সমবায় সমিতির পাট ক্রয়ের নামে কিছু সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও খারাপ ব্যবস্থাপনার জন্য একদিন তারা এই ব্যয়বহুল ব্যবসা বন্ধ করে দেয় এবং বড় ব্যবসায়ীদের শোষকশ্রেণী বলা হলেও সব সরকারেরই রাজনীতি করতে আনুষঙ্গিক চাঁদার জন্য ওই শোষকশ্রেণীই ভরসা। ফলে আমরা দেখতে পাই, পাটের দাম যখন ভালো থাকে তখন অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে রাজনীতি হলেও পাটের দাম যখন আন্তর্জাতিক বাজারে হ্রাস পায় তখন রাজনৈতিক শত্রু ঘায়েল করার এক মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে পাটকে ব্যবহার করা হয়। এতে দেশের প্রকৃত লাভ কিছুই হয় না। পাটের ওপর নির্ভরশীলতা আমাদের দেশের একটি দুর্বলতা, যাকে জন্মগত অসুস্থতা বলা চলে। যে শ্রেণী পাটের এ দুর্বলতাকে রাজনৈতিক মূলধন হিসেবে ব্যবহার করে থাকে, এখন শিক্ষিত সমাজের উচিত তাদের নিন্দা করা এবং চাষীকে প্রকৃত সত্য বুঝতে দেয়া।

পাটের বিপণন গুণাবলি

সঙ্গত কারণেই পাট সম্পর্কে গত অর্ধশতাব্দীতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ হয়েছে, বাংলাদেশের আর কোনো বস্তুর উৎপাদন বা বিপণন সম্পর্কে ততটা হয়নি। এগুলোর সারমর্ম এই যে বছর বছর পাটের মূল্যের ওঠানামা খুব বেশি হয়ে থাকে এবং তা প্রায়ই আগে থেকে অনুমান করা যায় না। এর কারণ দ্রব্য হিসেবে পাটের কতগুলো বিপণন বৈশিষ্ট্য। কৃষিপণ্য হিসেবে পাটের ফলন প্রাকৃতিক কারণে কোনো বছর বেশি বা কম হতে পারে। দ্বিতীয়ত. চা, কফি বা বরাবরের মতো পাট একটা বিশেষ এলাকায় বড় ধরনের মালিকানায় উত্পন্ন পণ্য নয়। অসংখ্য ক্ষুদ্র ও অশিক্ষিত কৃষক নিজের জমির একাংশে মাত্র পাট চাষ করেন। অনেক জমিতেই পাট ছাড়া অন্য ফসল, বিশেষ করে আউশ ধান বোনা সম্ভব। কোন বছরে কত জমিতে পাট চাষ করবেন, সেটা কৃষক স্থির করেন আগের বছরের পাটের দাম, বিকল্প ফসলের সম্ভাব্য বাজার দাম এবং নগদ অর্থের প্রয়োজন বিবেচনা করে, যার ওপর চেষ্টা করেও সরকার অতীতে কোনো নিয়ন্ত্রণ বহাল করতে পারেনি। তৃতীয়ত. এ বছরে যেটুকু পাট উৎপাদন হবে, বিশ্বের বাজারে তার চাহিদা এবং মূল্য কত হবে, সেটা নির্ভর করে আগামী বছরে পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা, স্টক ও মূল্য কী রকম হতে পারে, তার অনুমানের ওপর। চতুর্থত. পাটজাত দ্রব্যের আগামী বছরের চাহিদা এবং মূল্য কী হবে তা নির্ভর করে তারও পরের বছরে বিশ্ববাণিজ্যের পরিমাণ কেমন হবে তার অনুমানের ওপর। কারণ প্রধানত মোড়ক হিসেবে পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা অধিক হবে যদি বিশ্বের বাণিজ্য তেজি হয় এবং অল্প হবে যদি বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেয়। পঞ্চমত. মোড়কের জন্য পাটজাত দ্রব্য ছাড়া অন্যান্য বিকল্পের দাম কেমন হবে, তার অনুমানের ওপর পাটের চাহিদা নির্ভর করে। কারণ মোড়ক একটা ব্যবসায়িক দ্রব্য, ভোক্তার ব্যবহূত দ্রব্য নয়। এতে অভ্যাস বা রুচির প্রশ্ন নেই। অতি সামান্য ব্যয় হ্রাসের সম্ভাবনা থাকলেও ব্যবসায়ী লাভ-বৃদ্ধির জন্য বিকল্প ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেবে। ষষ্ঠত. এছাড়া রয়েছে ‘আন্দাজ’ নিয়ে যারা কারবার করে, সময় সময় বাজি ধরে, সেই শ্রেণীর (অর্থাৎ প্রকৃত ক্রেতার অতিরিক্ত) পাট ব্যবসায়ে নিযুক্ত ‘স্পেকুলেটরদের’ চাপ। এক কথায়, এ বছর কাঁচা পাটের জন্য চাষী কত দাম পাবেন, সেজন্য এতগুলো অনিশ্চিত বিষয়ের সম্পর্কে বাজারের প্রত্যাশা, তথ্য এবং আন্দাজের ওপর নির্ভর করতে হয় যে পাটের মূল্য সম্পর্কে কোনো রকম ভবিষ্যদ্বাণী এ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য হয়নি। দুই বছর পরে একটা যুদ্ধ শুরু হতে পারে কিনা, বাজারে ‘স্পেকুলেটর’ শ্রেণীর হাতে বাড়তি পয়সা হয়েছে কিনা অথবা আগামী বছরে চালের মূল্য কম রাখার জন্য বিদেশী খাদ্য সাহায্য আনা হবে কিনা, এ ধরনের অতিদূরত্বের সম্ভাবনাও পাটের চূড়ান্ত মূল্যকে প্রভাবিত করে। তাই পাটের দাম যতই কমে থাক, কয়েক বছর পরে যে হঠাৎ একবার তা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েও যেতে পারে, ঐতিহাসিকভাবে এটাই সত্য। পাটের বাজারের এ বৈশিষ্ট্যের জন্যই ক্রমে পাটের আন্তর্জাতিক মূল্য গড়ে আমাদের সাধারণ মূল্যমানের তুলনায় কমে গেলেও দেখা যাচ্ছে, চাষীরা তা চাষ করে যাচ্ছেন এবং ব্যবসায়ীরাও লোকসানের ঝুঁকি নিয়েও প্রতি বছর পাটের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। যাদের মধ্যে কিছুটা ‘গ্যামব্লিং স্পিরিট’ রয়েছে, তারা স্বভাবতই অন্য ব্যবসার চেয়ে পাটের ব্যবসায় গিয়ে আনন্দ পান। আরেকটি প্রাসঙ্গিক কথা হলো, পাটের ব্যবসায়ের শেষ পর্যায়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হয়ে থাকে। বৈদেশিক মুদ্রার নিয়ন্ত্রণ থাকার ফলে যারা বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়াতে চান, তারা দেশে লোকসান দিয়েও বিদেশের বাজারে ‘ইনভয়েসিং’-এ কিছু ফাঁকির মাধ্যমে অথবা বিশেষ সুবিধার বলে সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারেন।

দেশের দরিদ্র সাধারণ মানুষের সম্পদ পাট, তাই এতে সরকার ভর্তুকি বা সহজ ঋণ দিতে কার্পণ্য করে না। সরকারের এ দুর্বলতার সুযোগ নেয়ার জন্য অনেক ব্যবসায়ী পাট রফতানি বা পাটজাত দ্রব্যের ব্যবসায়ে ঢুকে পড়েন এবং বেকায়দার বছরে পাটের ব্যবসার ক্ষতি তারা অন্য ব্যবসায় পুষিয়ে নেন। সুতরাং আমাদের ব্যবসায়ীদের পাটের ব্যবসায় এখনো কোনো বৈরাগ্য আসেনি।

পাটের অর্থনীতি

পাট চাষ খুব একটা কমেনি। ১৯৪৭-৪৮ সালে পাট চাষের জমি ছিল ২ হাজার ৫৯ হাজার একর। ১৯৬৬-৬৭ সালে পাটের আবাদ হয় ২ হাজার ১৬৫ হাজার একর। মাঝে ১৯৭৫-৭৬ সালে তা কমে ১ হাজার ২৭৭ হাজার একর হয়েছিল, কিন্তু ১৯৮৫-৮৬ সালে আবার তা বেড়ে ২ হাজার ৬১৪ হাজার একর হয়েছিল। একরপ্রতি ফলন গড়ে প্রায় ১৫ মণের কাছাকাছিই ছিল ১৯৫৪-৫৫ সালে। ওই পরিমাণের থেকে ফসল কখনো সামান্য বেশি কখনো সামান্য কম হয়। ১৯৮৪-৮৫ সালেও তা প্রায় ওই পরিমাণই ছিল। ধানের মতো পাটে কোনো ফলন বিপ্লব হয়নি। ধানের তুলনায় পাটের মূল্য কমার ফলে এর চাষ যে কমে যাবে— এমন আশঙ্কা থাকলেও দেখা যাচ্ছে, আসলে তা ঘটেনি। পাটের মূল্য যেমন কমেছে, ধানের ফলনও তেমনি বাড়লেও তার উৎপাদন ব্যয় ভর্তুকি ছাড়া চিন্তা করলে বিশেষ একটা কমেনি। সরকার ক্রমাগত টাকার বৈদেশিক বিনিময় মান কমিয়ে পাটকে যোগ্য রাখছে। তবে উৎপাদন দক্ষতা বাড়লে তা দরকার হতো না।

গত অর্ধশতাব্দীতে পাটের মূল্য চলতি টাকার অংকে অবশ্যই বেড়েছে। ১৯৫০-৫১ সালে চাষী গড়ে পাটের মূল্য মণপ্রতি পেয়েছেন প্রায় ২৫ টাকা। প্রতি বছর ওঠানামার পর ১৯৮৪-৮৫ সালে তা হয়েছিল প্রায় ৫০০ টাকা। এ মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ ২০ গুণ। শেষের বছরে অবশ্য পাটের দাম খুব বেড়েছিল। পরবর্তী বছরে দাম খুব কমে যায় (১৯০ টাকা মণ)। ১৯৫০-৫১ সালের তুলনায় মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ ১৯৮৫-৮৬ সালে মাত্র আট গুণ হয়। চালের মণপ্রতি মূল্য ১৯৫০-৫১ সালে ছিল প্রায় ২০ টাকা, যা ১৯৮৪-৮৫ সালে হয়েছে প্রায় ৩৫০ টাকা। অর্থাৎ বৃদ্ধির পরিমাণ ১৭ গুণ। টাকার অংকে পাট আর চালের মূল্য কোনো কোনো বছর সমানতালে চললেও কোনো কোনো বছর পাটের মূল্য হয়েছে বিশেষভাবে নিম্নমুখী। পাট আমাদের অন্যতম রফতানি সামগ্রী,  এর মূল্য যদি ওই সময়ে ২০ থেকে আট গুণের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে, আমাদের প্রয়োজনীয় আমদানি সামগ্রীর বেলায় অবস্থা কী? আমদানি সামগ্রীর মধ্যে একটি অতি প্রয়োজনীয় বস্তু সিমেন্টের খুচরা মূল্য ওই সময়ের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১০ টাকা থেকে ইউনিটপ্রতি প্রায় ১২০ টাকা, অর্থাৎ মাত্র ১২ গুণ। এক্ষেত্রে তুলনামূলক অবস্থাটা খুব খারাপ নয়। অবশ্য এখানে বলা চলে, বৈদেশিক সাহায্য বা ঋণ না পেলে আমরা প্রয়োজনীয় সব দ্রব্য আমদানি করতে পারতাম না। বাজারে তখন হয়তো দাম বেশি হতো। যেমনভাবে বলা চলে রেশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণ না করলে সম্ভবত তা আরো বেড়ে যেত। সাম্প্রতিক কালে পাটের দাম খুব কমে গেছে দেখা গেলেও পাটের জন্য এটা কোনো নতুন খবর নয়। পাটের দাম চালের তুলনায় কোনো কোনো বছর এর আগেও খুব কম হয়েছে, যেমন ১৯৫২-৫৩, ১৯৫৮-৫৯, ১৯৬৭-৬৮ ও ১৯৭৪-৭৫ সালে। এসব বছরে অনেক সময় এক মণ পাটের দাম এক মণ চালের অর্ধেকও হয়েছে।

পাট থেকে আমাদের যে আয় হয়, অর্থনীতিতে তার গুরুত্ব কি কমছে না বাড়ছে? ১৯৫৯-৬০ সালে পাট ও পাটজাত দ্রব্য রফতানি করে পাওয়া গিয়েছিল (চলতি মূল্যে) ৯৪ দশমিক ৩ কোটি টাকা, আর সেই বছরে পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক আয় ছিল মোট ৫৯৮ দশমিক ৫ কোটি টাকা। ২৫ বছর পরে অর্থাৎ ১৯৮৪-৮৫ সালে পাট ও পাটজাত দ্রব্য রফতানি করে বাংলাদেশ (চলতি মূল্যে) অর্জন করে ১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। ওই বছরে জাতীয় আয় ছিল ৩৪ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা। দেখা যাচ্ছে, গত ২৫ বছরে আমাদের জাতীয় আয়ে পাটের অবদান ১৭ দশমিক ৫ থেকে হ্রাস পেয়ে ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশে নেমে এসেছে। পাটের অবদান সাধারণভাবে আমাদের অর্থনীতির জন্য এখন গৌণ। পাট শিল্পের প্রতিষ্ঠা না হলে অবশ্যই এ অংশ আরো কমে যেত। জাতীয় আয়ে পাটের অবদানের হ্রাস একটা উন্নতির লক্ষণ। কারণ একটি সুস্থ ও স্বাবলম্বী দেশের উচিত তার উৎপাদন ও ভোগকে বহুমুখী করে তোলা। জন্মলগ্নে এ দেশের অর্থনীতি পাটের ওপর যে এককভাবে নির্ভরশীল ছিল, সেটা ঔপনিবেশিক অর্থনীতির প্রতিফলন। এক ঝুড়িতে সব ডিম নিয়ে যাওয়ার কুফল হলো, সেই ঝুড়িতে যদি কখনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে চরম দুর্দশায় পড়তে হয়। দেশের মানুষের নিজ প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর জন্য এককভাবে আমদানিনির্ভর হওয়ারও কুফল একই। বাংলাদেশের জাতীয় আয়ে পাটর গুরুত্ব যত দ্রুত কমানো যাবে, দেশের অর্থনীতি যত বহুমুখী হবে, আমাদের জন্য তা ততই কল্যাণকর। এখানে একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো, অতীতের তুলনায় পাট চাষের লাভ কি কমে এসেছে? ইংরেজ যুগে গড়ে পাটের দাম তুল্য পরিমাণ চালের দামের চেয়ে কিছু বেশি ছিল। একালে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৭২-৭৩ থেকে ১৯৮৫-৮৬— এ ১৪ বছরে চালের বার্ষিক মূল্যের গড় হলো মণপ্রতি ২১৬ টাকা এবং একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে পাটের গড় মূল্য ছিল মণপ্রতি ১৫২ টাকা। গত দেড় দশকে গড়ে এক মণ পাট বিক্রি করে চাষী শূন্য দশমিক ৭০ মণ চাল কিনতে পেরেছে। এরই মধ্যে চাল উৎপাদন ব্যয় কত, সেই চিত্রটা এখন অনেক ঘোলাটে। কারণ চাল উৎপাদনে নতুন কৌশল অর্থাৎ উচ্চফলনশীল ধানের চাষ এসেছে, তাতে সরকার থেকে নানা আকারে প্রচুর ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। আবার রেশনিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক ঋণ ইত্যাদি থেকে পাওয়া চাল বণ্টনের মাধ্যমে চালের মূল্য হ্রাস করা হচ্ছে, বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা হচ্ছে এবং সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ে সেই বিক্রয়লব্ধ টাকা খরচ করা হচ্ছে। সময় সময় টাকার মূল্যহ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে দাম অবশ্যম্ভাবী প্রক্রিয়ায় কিছু বাড়ছে, কিন্তু এতে বাজার অর্থনীতি পুরো কাজ করছে না। অন্যপক্ষে আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের মূল্য মোটের ওপর তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। বিশ্বের কারিগরি কৌশল ক্রমে পরিবর্তিত হচ্ছে, যাতে পাটের বর্তমান বাজার কিছুকাল থাকলেও তার সম্প্রসারণের কোনো সম্ভাবনা নেই। সমস্যা সমাধানে জোড়াতালি দেয়ার প্রয়োজনে আমাদের সরকার ডলারের তুলনায় টাকার মূল্য হ্রাস করেছে, যাতে পাট উৎপাদন চাষীর পক্ষে লাভজনক হয়। ১৯৫৫ সালের জুলাইয়ের আগে যে টাকার বিনিময়মূল্য ছিল ৩০ সেন্ট, জুলাই ১৯৮৭ সালে তার মূল্য এসে দাঁড়ায় মাত্র ৩ সেন্টে। তাই চালের তুলনায় এখন পাটের মূল্য কম হওয়া সত্ত্বেও শুধু টাকার বৈদেশিক মূল্য হ্রাস করে এবং পটকলের লোকসান আর পাট কেনার ঋণ অনাদায়ের সুযোগ দিয়েই আমরা পাট চাষ চালিয়ে যাচ্ছি। বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য না পেলে এবং নিজের দেশে মুক্ত বাজার অর্থনীতি চালু থাকলে পাট চাষ করা সম্ভব ছিল কিনা, সেটা একটা প্রশ্ন। তার উত্তর একাধিক হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের মূল্য হ্রাস কোনো স্বল্পমেয়াদি ব্যাপার বলে মনে হয় না। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদকদের মতে, ১৯৮৬ সালের গোড়া থেকে কাঁচামালের দাম শিল্পজাত দ্রব্যের তুলনায় ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। তাদের মতে, এর কারণ শিল্পে শ্রম ও কাঁচামালের ব্যবহার ক্রমে কমে আসছে। বিশ্ববাণিজ্যে দ্রব্যের আমদানি-রফতানির বদলে এখন পুঁজি ও সেবার আমদানি-রফতানিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। টাকার বিনিময় হার বিশ্বের বাজারে এখন দ্রব্য ও সেবার প্রকৃত লেনদেনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব লাভ করছে। কৃষিজ পণ্যের উৎপাদন বেড়ে চলেছে। সম্ভবত শিল্পোৎপাদনের মূল্যের তুলনায় কাঁচামালের দাম অদূরভবিষ্যতে একটা বড় রকমের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ছাড়া  অন্য কোনো কারণে আর বাড়বে না। ভবিষ্যতে বাজার তাদেরই হবে, যেসব দেশ শ্রমের গুণগত মান বৃদ্ধি করতে পারবে এবং উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দেবে।

গত ২৫ বছরে আমাদের প্রকৃত জাতীয় আয় বেড়েছে এবং তুলনামূলকভাবে জাতীয় আয়ে পাটের গুরুত্ব ধীরগতিতে হলেও কমে এসেছে। অবশ্য জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি হয়েছে অতি অল্প। পাটের জন্যই আমাদের টাকার মূল্য উপমহাদেশের মধ্যে আজ সর্বনিম্ন। ১৯৪৭ সালে এ উপমহাদেশে টাকার বিনিময় হার সমান ছিল, এখন বাংলাদেশের টাকার বিনিময় হার ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে অনেক নিচে। টাকার মূল্য ক্রমে হ্রাসের ফলে দেশে সঞ্চয় নিরুৎসাহিত হচ্ছে। বৈদেশিক সাহায্য আসার ফলে দেশের উৎপাদন ক্ষেত্রবিশেষে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। পাটের বাজার আরো অনেক দিন থাকবে, যদি আমরা কম খরচে বিশ্বকে এ কাঁচামাল এবং এর থেকে উত্পন্ন শিল্পজাত দ্রব্য সরবরাহ করতে পারি। দেশে মজুরি ও বিকল্প ফসলের দাম বাড়লে আমরা সস্তা পাট বা পাটজাত দ্রব্য সরবরাহের গ্যারান্টি দিতে পারব না। তাই পাট উৎপাদন অদূরভবিষ্যতে একদিন অলাভজনক হতে পারে। সেটা আমাদের মনে রেখেই কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তার ক্রমবিকাশে পাট অনেক কাজে লেগেছে, অবশ্য সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থ তাতে শক্তি জুগিয়েছে। সেটা সম্পূর্ণ আমাদের কর্মফলও নয় এবং আমাদের তাতে গর্ব করার মতো কিছু  নেই। বিদেশীদের শ্রম, স্বার্থ আর রাজনীতি এতে অনেকটা কাজ করেছে। দেশের অভ্যন্তরে পাট একটি শ্রেণীকে নতুন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি করে তুলেছে, সরকারের ওপর তাদের প্রভাব বেড়েছে। সরকারের দেয়া ভর্তুকি ও ঋণ ব্যবহার করে তারা স্বদেশে ও বিদেশে পাটের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পদ সৃষ্টি করতে পেরেছে, যা ১৯৪৭ সালের পূর্ব বাংলার মুসলিম সমাজের কাছে ছিল অকল্পনীয়। বৈদেশিক বাণিজ্যে সাধারণভাবে আমাদের বাণিজ্যিক শর্ত ক্রমে বিপক্ষে চলে গেছে। উন্নত দেশগুলো অবশ্য তাতে সমবেদনা প্রকাশ করেছে আর বৈদেশিক ঋণ-সাহায্য দিয়ে তার ক্ষতিপূরণে সহায়তা করেছে। প্রতিদানে তারা আমাদের টাকার বিনিময়ের হার ক্রমে কমিয়ে দিতে বাধ্য করেছে। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ‘বাজার অর্থনীতির’ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াতেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পাটের লাভজনকতা ও গুরুত্ব ক্রমে কমে এসেছে। অর্থনীতিকে বহুমুখী করার জন্য এখন সে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তার মোকাবেলা করা না হলে দেশে বেকার, অশিক্ষিত যুব সম্প্রদায়ের সংখ্যা বৃদ্ধি, উচ্ছৃঙ্খলতা এবং দরিদ্র নিরক্ষর মানুষের অসন্তোষ আমাদের অর্থনীতিকে এক নৈরাজ্যের দিকে নিয়ে যাবে। যেকোনো মূল্যে রফতানি বৃদ্ধি, ঋণ করে হলেও আমদানি বৃদ্ধি আর দেশের শিক্ষার মান ক্রমে অবনত করে শিক্ষার জন্য বিদেশের দ্বারস্থ হওয়া— এগুলো বিদেশী মুরুব্বিদের পছন্দসই হলেও তাতে আমাদের লাভ কতটা তা ভেবে দেখতে হবে।

উপসংহারে বলব, অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে পাট চাষ ও পাট শিল্পের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সেগুলোকে বাজারশক্তির ওপর ছেড়ে দেয়াই শ্রেয় পথ। পাটের ব্যবসায়ে স্থিতিশীলতা আনা ও পাটের মূল্যবৃদ্ধির অহেতুক ব্যায়ামে অতীতে যে ভর্তুকি, ঋণ ও লোকসান দেয়া হয়েছে এবং নিয়ন্ত্রণের ব্যয়বহুল যন্ত্র পোষা হয়েছে, ইতিহাসের সাক্ষ্যে তাতে শুধু একটি নীতিহীন, দক্ষতাহীন ধনিক শ্রেণীই সৃষ্টি করা হয়েছে, অর্থনীতি বা সাধারণ মানুষের প্রকৃত কল্যাণ তাতে আসেনি। এখন তারা দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের শক্তিতে যদি টিকে থাকতে না পারে, তাতে কারো দুঃখ থাকার কথা নয়। আমাদের মাটি, মানুষ আর প্রকৃতি অনেক কিছুই উৎপাদন করতে পারে, বহির্বিশ্বে এবং দেশের ভেতরে যার চাহিদা আছে, এর প্রমাণ এরই মধ্যে পাওয়া গেছে। সেসব কৃষিজ ও শিল্পজ উৎপাদনকে উৎসাহ দেয়ার অর্থ এই নয়, পাটের চাষ এখনই তুলে দিতে হবে। বার্ধক্যগ্রস্ত রোগীকে ওষুধ, ইনজেকশন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে বরং আমাদের এই অতি দরিদ্র সাম্রাজ্যবাদের শিকার অর্থনীতিতে কারিগরি উদ্ভাবনী বহুমুখীকরণ, নতুন দিগন্তের অনুসন্ধান এবং স্বাবলম্বী তরুণ এক শক্তিশালী বাংলাদেশ অর্থনীতি গড়ে তোলার স্বার্থে এর কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকেই সরকারের সীমাবদ্ধ দক্ষতা ও অর্থ বিনিয়োগ করা উচিত।

[বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষা থেকে পুনর্মুদ্রণ]

0 Comments

Leave a Comment

আমাদের অনুসরণ করুন

GOOGLE PLUS

INSTAGRAM

LINKEDIN

YOUTUBE

বিজ্ঞাপন দিন

সাম্প্রতিকজনপ্রিয়ট্যাগ

বিজ্ঞাপন দিন

লগ ইন/সাইন আপ

Advertisement

error: Content is protected !!