Friday, January 22, 2021

গাছ আমাদের পরম বন্ধু। এটি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। গাছ ছাড়া পৃথিবীতে আমাদের জীবন অচল। একসময়ের গাছপালাঘেরা ঢাকা আজ ইট-কাঠ-কংক্রিটের নগরী। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকা আজ বসবাসের অনুপযোগী। তবে বসবাসের এই প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণে ব্যক্তি ও সংস্থার উদ্যোগে চলছে নানা ধরনের  চেষ্টা। বাসাবাড়ির স্বল্পপরিসর আঙ্গিনায় ও ছাদে শুরু হয়েছে নগর কৃষি। ঢাকায় নগর কৃষির বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে সবিস্তারে লিখেছেন শওকত আলী

 

রাজধানীর আদাবরের বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটির একটি বাসায় থাকেন আফরোজা আক্তার রোজি। এটি তাঁর নিজের বাসা। পরিপাটি সিঁড়ি বেয়ে সাততলার ছাদ পর্যন্ত উঠে গেলে এতগুলো সিঁড়ি ভাঙার কষ্ট আর থাকে না। কারণ ছাদের দরজা খুললেই যে চোখে পড়ে শুধু গাছ আর গাছ, সবুজের সমারোহ। সামনের কিছু জায়গা ছেড়ে দিয়ে ছাদের কিনারজুড়ে দুই লাইনে সারিবদ্ধভাবে রয়েছে নানা রকমের ফল, মসলার ও ঔষধি গাছ। আবার ছাদের সীমানাপ্রাচীরের সঙ্গে একটু পর পরই পাকা বেড। যেগুলোর মধ্যে লাগানো রয়েছে নানা ধরনের সবজি। এই ছাদের ওপর রয়েছে আরো একটি ছোট ছাদ। স্টিলের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দেখা যায় নানা ফুলের গাছ। আবার মূল ছাদ থেকে এক ফ্লোর নিচে রয়েছে আরো একটি ছোট ছাদ। যেখানে রীতিমতো চাষ হচ্ছে বিভিন্ন সবজির।

 

মোট কত রকমের কতগুলো গাছ রয়েছে সে হিসাব বলতে বলতে বাড়ির মালিক নিজেই হাঁপিয়ে উঠলেন। জানা গেল ফলগাছের মধ্যে রয়েছে লটকন, আমড়া, পেয়ারা, ডালিম, আম, সফেদা, জামরুল, তেঁতুল, নারকেল, মালটা, কলা, কতবেলসহ আরো হরেক রকমের গাছ। করমচা, বাতাবিলেবু, তুলসী, চিরতা, দারচিনি, আখ যেমন আছে, তেমনি এই ছাদে চাষ হচ্ছে পুঁইশাক, লালশাক, ঢেঁড়স, শসা, চালকুমড়া, টমেটো, পেঁপে, কচুশাক, পুদিনাপাতা, থানকুনি ও অ্যালোভেরা। আবার গোলাপ, গাঁদা, বেলির মতো সৌন্দর্য বাড়াতে নানা রকমের ফুলের গাছও রয়েছে। ছাদে চাষ করার মতো উন্নত প্রজাতির গাছ হওয়ায় এগুলো খুব একটা না বাড়লেও নিয়মিত ফল পাওয়া যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

আফরোজা আক্তার রোজি তাঁর বাগান করার বিষয়ে বলতে গিয়ে বলেন, ‘নিয়ম করে গাছগুলোর কাছে না আসতে পারলে এখন আর ভালো লাগে না। সকালবেলা ছাদে এসে অনেক পাখির কিচিরমিচির ডাক শুনি, যা অসম্ভব ভালো লাগে। টাটকা ফলমূল, সবজি সবই পাচ্ছি এই ছাদ থেকে। সারা বছরই এগুলো আমার পরিবারের চাহিদা যেমন মেটাচ্ছে, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে পাঠালেও তারা অনেক খুশি হয়।’ গাছগুলো শুধু ছাদের সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না, পরিবারের বড় প্রয়োজন মেটাতেও সহযোগিতা করছে। এই বাসার ছাদ থেকে আশপাশে তাকালে বেশির ভাগ ছাদই দেখা গেল নানা রকমের ফল ও ফুলের গাছে পরিপূর্ণ।

মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ার একটি বাসার মালিক অধ্যক্ষ মোস্তফা হাসান ইমাম। তিনিও অবসরে যাওয়ার পর এখন ছাদ বাগান নিয়েই বেশি ব্যস্ত সময় কাটান। মূল ছাদ ও সিঁড়িঘরের ওপরে এই দুই স্তরের ছাদে তিনিও লাগিয়েছেন নানা পদের গাছ। প্রথম ছাদে তমালিকা, মে ফুলসহ নানা ধরনের ফুলগাছের সমাহার থাকলেও ওপরে গেলেই দেখা মেলে ফল ও সবজির বাগান। এখানেও পেয়ারা, আপেল, কুল, বাউকুল, সফেদা, ডালিম, আখ, কমলা, থাই জাম্মুরা, আম, পেঁপে, আনারস, মালটা, আমলকী, পুঁইশাক, মরিচের মতো অনেক গাছই রয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোস্তফা হাসান ইমাম জানালেন, গত ছয় মাসে তাঁর পরিবারের জন্য কোনো কাঁচা মরিচ কিনতে হয়নি। সবই নিজের ছাদে চাষ হয়েছে। সারা বছরই বিভিন্ন ফল ও সবজি তো আসছেই। তাঁর ছাদেও এত ধরনের গাছ রয়েছে যে সঠিক সংখ্যাটাও বলতে পারলেন না। তিনি আরো বলেন, ‘সব ধরনের গাছই রয়েছে। কিছু গাছ ও ড্রাম দিয়ে সহযোগিতা করেছিল জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও। পরে অবশ্য আমি নিজেই আরো গাছ বৃদ্ধি করেছি। বাগান থেকেই আমার সবজির বেশির ভাগ চাহিদা মিটে যায়। এর বাইরে অনেক ফলমূল খেতে পারছি। এখন যত ধরনের ফলমূল খাচ্ছি নিজের বাগান থেকে, একটা সময় হয়তো এত ফলমূল কিনতামও না।

এই দুই বাগান মালিকই জানালেন, ছাদ বাগান শুধু সৌন্দর্য বর্ধনেই সীমাবদ্ধ নেই, কীটনাশকমুক্ত নিরাপদ খাবারের বড় একটি উৎস হয়ে উঠেছে। আর এ কারণেই ঢাকায় ছাদের ওপর বাগান করার আগ্রহটা অনেক বেড়েছে বলে জানা গেছে। একটা সময় শুধু ফুলগাছ দিয়ে বাগান করার চিন্তা করলেও এখন বাগানগুলো ফুল, ফল ও সবজিতে ভরে উঠছে। তবে ঢাকা শহরের কতগুলো ছাদে বাগান আছে তার কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন এলাকার মাঠকর্মীদের কাছে অনেকেই যাচ্ছেন পরামর্শ ও সহযোগিতার জন্য। তাঁরা শুধু পরামর্শই দেন না, কোথায় কী পাওয়া যায়, কিভাবে কী করতে হয়, কোথায় প্রশিক্ষণ পাওয়া যাবে—সব কিছুতেই সহযোগিতা করে থাকেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এ রকম একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোসা. ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘বাগান এখন আর শখের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রয়োজনের তাগিদেই অনেকে বাগান করছেন। এখন অনেক ফল ও সবজির হাইব্রিড জাত রয়েছে। যেগুলো থেকে দ্রুত এবং বেশি পরিমাণে ফলন পাওয়া যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আগ্রহীদের বাগান করতে সহযোগিতা করি। আবার যাঁরা বাগান করছেন, তাঁদের কোনো সমস্যা হলে সেগুলো সমাধানের পরামর্শ দিই। নিয়মিতভাবে আমরা মনিটরিংও করি।’

ছাদের বাগান আসলে কেমন হওয়া উচিত এর জন্য এখন পর্যন্ত কোনো মডেল কোনো সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। তবে কত বেশি উপযোগীভাবে ছাদের বাগান কাজে লাগানো সম্ভব তার ওপর সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ঢাকা ও চট্টগ্রামে একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি নিয়ে কাজ করা সংস্থা এফওএ। যেখানে শুধু ফুল নয়, রয়েছে ফল ও সবজি চাষ করে কিভাবে নিরাপদ খাদ্যের সংস্থান করতে হবে তার পরিকল্পনা। এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকায় ১৫০টি এবং চট্টগ্রামে ১০০টি বাড়ির ছাদে বাগান করতে সহযোগিতা করেছে। যেখানে তারা গাছ লাগানোর ড্রাম ও গাছ দিয়েছে। ৬০০ আগ্রহীকে দিয়েছে প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ১০০ মালি, যাঁরা বিভিন্ন বাসায় গিয়ে বাগান তৈরির কাজ করে দিতে প্রস্তুত। কেউ চাইলেই তাঁদের দিয়ে নিজের ছাদের বাগানটি গুছিয়ে নিতে পারেন। কারণ তাঁরা সবই জানেন। কোথা থেকে মাটি, জৈব সার আনতে হবে, কোন গাছের জন্য কেমন ড্রাম দরকার হবে, সেগুলো কোথায় পাওয়া যাবে অর্থাৎ একটি বাগান করতে যা যা দরকার তার সব কিছুতেই তাঁরা সহযোগিতা করতে পারেন।

কামরুল হোসেন নামের প্রশিক্ষণ নেওয়া এক মালি জানান, তিনি বর্তমানে ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর ও মহাখালী ডিওএইচএস এলাকার ২০টি বাগান পরিচর্যা করে থাকেন। শুধু পরিচর্যাই নয়, কেউ বাগান করে দিতে বললেও সেটা করেন। তিনি কালের কণ্ঠের ৩৬০ ডিগ্রিকে বলেন, ‘প্রতিটি বাগানের দেখাশোনার জন্য মাসে চার থেকে পাঁচ দিন করে বাগানগুলোতে কাজ করি। এর জন্য ১৫০০-২০০০ টাকা করে নেই। আর বাগান করে দিতে হলে সেটা আলোচনা সাপেক্ষে খরচ নিই। যে যেভাবে চায় সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী বাগান করে দেই। আবার আমিও পরামর্শ দেই কোনটা ভালো হবে।’

এই প্রকল্পে সহযোগী হিসেবে ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ডেপুটি ডিরেক্টর মো. এনায়েত হোসেন। তিনি ঢাকা ও চট্টগ্রামে কাজ করেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘শহরের মানুষের জন্য মুক্ত বাতাস ও নিরাপদ খাবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দুটি জিনিসের জন্যই ছাদ বাগান একটি সমাধান। আমরা কিছু মানুষকে বাগান করে দিয়েছি, প্রশিক্ষণ দিয়েছি। পাশাপাশি তাদের সচেতন করেছি। আগের চেয়ে মানুষ এখন ছাদ বাগানে অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা মানুষকে পরামর্শ দিচ্ছি কিভাবে ছাদের স্বল্প জায়গা কাজে লাগিয়ে ফুলের পাশাপাশি ফল ও সবজি চাষ করা সম্ভব। এটা এখন মানুষ দারুণভাবে গ্রহণ করছে। যাঁরা এভাবে বাগান করছেন, তাঁরা নিরাপদ খাবার গ্রহণের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন। একই সঙ্গে শহরের পরিবেশেরও মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এই বাগানগুলো। তবে নতুন করে যাঁরা বাড়ি তৈরি করছেন, তাঁদের বেশির ভাগই শুরুতেই বাগান করছেন।’ বাগান করার ক্ষেত্রে ঢাকার চেয়ে চট্টগ্রামের বাড়িওয়ালারা বেশি আগ্রহী ও মনোযোগী বলে জানান এ কর্মকর্তা। এই প্রকল্পের সফলতার কারণে সরকার নতুন একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নিচ্ছে বলে জানা গেছে। ‘নগর কৃষি উৎপাদন সহায়ক প্রকল্প’ নামের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও সাভার উপজেলায়। তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসাবাড়িতে বাগান করতে উৎসাহিত ও সহযোগিতা করবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। বাস্তবায়নেও থাকবে এই প্রতিষ্ঠানটি। প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

রাজধানী ঢাকায় গাছ লাগানোর জায়গা নেই বললেই চলে। শুধু রাস্তার আইল্যান্ড ও ফুটপাতের পাশে সিটি করপোরেশন সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য গাছ লাগায়। এর বাইরে যেটুকু জায়গা তা-ও শুধু বাসাবাড়ির ছাদ। যদিও কিছু কিছু বাসার সামনেও বড় বড় কিছু গাছ দেখা যায়, তবে সংখ্যায় তা খুবই কম। এদিকে ফুটপাতগুলো ব্যবসায়ীদের দখলমুক্ত করে নিরাপদে মানুষের হাঁটার উপযোগী করে তুলতে বিভিন্ন মহল থেকে বরাবরই দাবি উঠেছে। যেখানে বড় একটি অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগানো। সম্প্রতি একটি মাত্র সড়কে কিছুটা কাজ হয়েছে। র‌্যাডিসন হোটেল থেকে এয়ারপোর্ট রাস্তা পর্যন্ত। এখানে বিভিন্ন গাছ লাগানো রয়েছে। রয়েছে বসার ব্যবস্থা ও টয়লেট। নানা ধরনের গাছের মধ্যে বেশি টাকা খরচ করে বনসাই লাগানোয় এই প্রকল্পটির সমালোচনা করেছেন অনেকেই। কারণ এই পরিবেশের সঙ্গে বনসাই মানানসই নয়। এ ছাড়া আমাদের দেশি হাজার রকমের গাছ থাকতে বনসাই কেন প্রয়োজন বলে মনে করা হয়। এটুকু বাদ দিলে বিভিন্ন গাছ লাগিয়ে এই জায়গাটিকে এরই মধ্যে মনোরম করে তোলা হয়েছে। যদিও পুরো কাজটি এখনো শেষ হয়নি। এয়ারপোর্ট পর্যন্ত এই কাজটি শেষ হলে সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে হাঁটার ও বিশ্রাম করার মতো একটা জায়গা পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে পুরো রাজধানীজুড়েই যেন এমন সৌন্দর্য বর্ধনসহ একটি বসবাস উপযোগী সবুজ ঢাকা গড়ে তোলা হয়, এমন দাবি সচেতন প্রত্যেক নগরবাসীর।

0 Comments

Leave a Comment

আমাদের অনুসরণ করুন

GOOGLE PLUS

INSTAGRAM

LINKEDIN

YOUTUBE

বিজ্ঞাপন দিন

সাম্প্রতিকজনপ্রিয়ট্যাগ

বিজ্ঞাপন দিন

লগ ইন/সাইন আপ

Advertisement

error: Content is protected !!