Friday, January 22, 2021

ধান গাছের পোকা ব্যবস্থাপনা

 

এখন পর্যন্ত ধানের ১৭৫ টি প্রজাতির ক্ষতিকর পোকা সনাক্ত করা হয়েছে।এদের মধ্যে ২০-৩৩ টি প্রজাতিকে ধানের প্রধান ক্ষতিকর পোকা হিসেবে ধরা হয়। পোকার ক্ষতির মাত্রা পোকার প্রজাতি, পোকার সংখ্যা, এলাকার পরিবেশ, জমি বা তার আশেপাশের অবস্থা, ধানের জাত, ধানগাছের বয়স, উপকারী পরভোজী ও পরজীবি পোকামাকড়ের সংখ্যা ইত্যাদির উপর নির্ভর  করে। শুধু প্রয়োজনে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।

ধানের পোকা

ধানের পোকা

প্রধান ক্ষতিকর পোকা ও তাদের দমন ব্যবস্থাপনা নিচে আলোচনা করা হলো।

মাজরা পোকা (Stem borer)
মাজরা পোকার কীড়া গাছের কুশি ও শিষের ক্ষতি করে। ফলে কুশি অবস্থায় আক্রমণ হলে মরা ডিগ ও ফুল আসার পর সাদাশিষ দৃষ্টি গোচর হয়। প্রায় সব অঞ্চলে সব ঋতুতেই এটি প্রধান ক্ষতিকারক পোকা হিসেবে পরিচিত –

  1. আলোক ফাঁদের সাহায্যে মথ সংগ্রহ করে দমন করুন।
  2. মাজরা পোকার ডিমের গাদা সংগ্রহ করে নষ্ট করুন।
  3. ডালপালা পুঁতে পোকাখেকো পাখির সাহায্য নিন।
  4. রোপা আমন ধান কাটার পর ক্ষেতে চাষ দিয়ে নাড়াগুলো মাটিতে মিশিয়ে বা পুড়িয়ে ফেলুন।
  5. পরজীবি পোকা শতকরা ৫০-৬০ ভাগ মাজরা পোকার ডিম নষ্ট করে থাকে, সুতরাং যথাসম্ভব কীটনাশক পরিহার করুন।
  6. জমিতে শতকরা ১০-১৫ ভাগ মরা ডিগ অথবা শতকরা ৫ ভাগ সাদা শিষ দেখা দিলে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করুন।

 

নলিমাছি বা গলমাছি (Gallmidge)
এ মাছির কীড়া ধানগাছের মাঝখানে বাড়ন্ত কুশিতে আক্রমণ করে। ফলে ঐ কুশি পেঁয়াজ পাতার মতো হয়ে যায়। এ অবস্থায় কুশিতে আর শিষ হয় না। রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুর এলাকায় এ পোকার আক্রমণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্যবস্থাপনার জন্য-
নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করুন।

১. আলোক ফাঁদ ব্যবহার করে পূর্ণবয়স্ক পোকা দমন করুন।
২.জমিতে শতকরা ৫ ভাগ পেঁয়াজ পাতার মতো লক্ষণ দেখা গেলে কীটনাশক ব্যবহার করুন । এ ক্ষেত্রে দানাদার কীটনাশক তরল কীটনাশকের চেয়ে বেশি কার্যকর।

 

পামরি পোকা (Rice hispa)
পূর্ণবয়স্ক পামরি পোকা ও কীড়া উভয়ই ধানগাছের ক্ষতি করে। পূর্ণৃবয়স্ক পোকা পাতার সবুজ অংশ কুরে কুরে খায়। কীড়া পাতার ভেতরে সুড়ংগ করে সবুজ অংশ খায়। এভাবে খাওয়ার ফলে পাতা সাদা দেখায়। ব্যবস্থাপনার জন্য-

১.সম্মিলিতভাবে হাতজাল বা মশারির কাপড় দিয়ে পূর্ণবয়স্ক পোকা ধরে মেরে ফেলুন। সকাল বেলা পোকা ধরার উত্তম সময়।
২.ধান ক্ষেতের বাইরে পামরি পোকা থাকলে সেখান থেকেও পোকা ধরে মারতে হবে।
৩.গাছের পাতায় ডিম বা ২-৩ টি কীড়া থাকলে এবং গাছ সর্বোচ্চ কুশি অবস্থার পূর্ব পর্যায়ে থাকলে পাতার গোড়ার ৩-৪ সেন্টিমিটার উপর থেকে কেটে নষ্ট করে পামরি পোকা দমন করা যায়।
৪. জমিতে শতকরা ৩৫ ভাগ পাতার ক্ষতি হলে অথবা প্রতি গোছায় ৪ টি পূর্ণবয়স্ক পোকা অথবা প্রতি কুশিতে ৫ টি কীড়া থাকলে কীটনাশক ব্যবহার করুন।

 

পাতা মোড়ানো পোকা (Leaf roller)
পাতা মোড়ানো পোকার কীড়া গাছের পাতা লম্বালম্বিভাবে মুড়িয়ে পাতার ভিতরের সবুজ অংশ খায়। খুব বেশি ক্ষতি করলে পাতা পুড়ে যাওয়ার মতো দেখায়। ব্যবস্থাপনার জন্য-

১.আলোক ফাঁদের সাহায্যে মথ সংগ্রহ করে দমন করুন।
২. ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পোকাখেকো পাখির সাহায্য নিন।
৩. পরজীবি পোকা পাতামোড়ানো পোকার শতকরা ৩০-৪০ ভাগকীড়া ধ্বংশ করতে পারে, তাই পরজীবি পোকার সংরক্ষণ ও সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য কীটনাশক ব্যবহার যথাসম্ভব পরিহার করুন।
৪. গাছে থোড় আসার সময় বা ঠিক তার আগে যদি শতকরা ২৫ ভাগ পাতা অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থ হয় তবে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করুন ।

 

চুঙ্গি পোকা (Rice caseworm)
চুঙ্গি পোকার কীড়া পাতার সবুজ অংশ এমনভাবে খায় যে শুধু পাতার উপরের পর্দাটা বাকী থাকে। কীড়া বড় হলে পাতার উপরের অংশ কেটে ছোট ছোট চুঙ্গি তৈরি করে ভেতরে থাকে। আক্রান্ত ক্ষেতে গাছের পাতা সাদা দেখায় এবং পাতার উপরের অংশ কাটা থাকে। দিনের বেলায় চুঙ্গিগুলো পানিতে ভাসতে থাকে। ব্যবস্থাপনার জন্য-
১. আলোক ফাঁদের সাহায্যে মথ সংগ্রহ করে দমন করুন।
২. পানি থেকে হাতজাল দিয়ে চুঙ্গিসহ কীড়া সংগ্রহ করে ধ্বংশ করুন।
৩. আক্রান্ত জমির পানি সরিয়ে দিন এবং মাটি শুকিয়ে নিন।
৪. জমিতে শতকরা ২৫ ভাগ পাতা ক্ষতিগ্রস্থ হলে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করুন ।

 

লেদা পোকা (Swarming caterpillar)
এ পোকার কীড়া পাতার পাশ থেকে কেটে এমনভাবে খায় কেবল ধানগাছের কান্ড অবশিষ্ট থাকে। সাধারণত শুকনো জমিতে এ পোকার আক্রমণের আশংকা বেশি থাকে। কারণ এদের জীবণচক্রের পুত্তলী অবস্থার জন্য শুকনো জমির দরকার হয়। ব্যবস্থাপনার জন্য-
১. রোপা আমন ধান কাটার পর ক্ষেতে চাষ দিয়ে নাড়াগুলো মাটিতে মিশিয়ে বা পুড়িয়ে ফেলুন অথবা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করুন।
২.আলোক ফাঁদের সাহায্যে মথ সংগ্রহ করে দমন করুন।
৩. ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পোকাখেকো পাখির সাহায্য নিন।
৪.সম্ভব হলে ২/১ দিনের জন্য ক্ষেতে ৫ সেন্টিমিটার পানি জমিয়ে রাখুন। এতে পুত্তলীগুলো মরে যাবে।
৫. জমিতে শতকরা ২৫ ভাগ পাতা- ক্ষতিগ্রস্থ হলে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করুন।

ধানের পোকা

ধানের পোকা

ঘাসফড়িং (Grasshoppers)
ঘাসফড়িং বাচ্চা ও পূর্ণবয়স্ক উভয় অবস্থায় ধানগাছের ক্ষতি করে। এরা ধানের পাতার পাশ থেকে শিরা পর্যন্ত খায়। জমিতে অধিক সংখ্যায় আক্রমণ করলে এদেরকে পঙ্গপাল বলা হয়। ব্যবস্থাপনার জন্য-
১. ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পোকাখেকো পাখির সাহায্য নিন।
২.জমিতে শতকরা ২৫ ভাগ পাতা ক্ষতিগ্রস্থ হলে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করুন ।

 

লম্বাশুঁড় উরচুঙ্গা (Long-horned cricket)
পূর্ণবয়স্ক পোকা ও বাচ্চা উভয় অবস্থায় ধানের পাতা এমনভাবে খায় যে পাতার কিনারা ও শিরা শুধু বাকি থাকে। ক্ষতিগ্রস্থ পাতা ঝাঁঝরা হয়ে যায়। ব্যবস্থাপনার জন্য-
১. ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পোকাখেকো পাখির সাহায্য নিন।
২.আলোক ফাঁদের সাহায্যে পূর্ণবয়স্ক পোকা দমন করুন।
৩. জমিতে শতকরা ২৫ ভাগ পাতা ক্ষতিগ্রস্থ হলে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করুন ।

 

সবুজ পাতা ফড়িং (Green leafhopper)
পূর্ণবয়স্ক পোকা ও বাচ্চা উভয় অবস্থায় সবুজ পাতা ফড়িং ধানের পাতার রস শুষে খায়। ফলে গাছের বৃদ্ধি কমে যায় ও গাছ খাটো হয়ে যায়। এ পোকা টুংরো ভাইরাস রোগ ছড়িয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। ব্যবস্থাপনার জন্য-
১. আলোক ফাঁদের সাহায্যে পূর্ণবয়স্ক পোকা দমন করুন।
২. হাতজালের প্রতি টানে যদি গড়ে একটি সবুজ পতাফড়িং পাওয়া যায় এবং আশেপাশে টুংরো রোগাক্রান্ত ধানগাছ থাকে, তাহলে বীজতলায় বা জমিতে উপযুক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করুন।

 

গাছফড়িং (Brown planthopper)
পূর্ণবয়স্ক পোকা ও বাচ্চা উভয় অবস্থায় বদামি গাছফড়িং ধান গাছের গোড়ায় বসে রস শুষে খায়। ফলে গাছ নিস্তেজ হয়ে যায় এবং ফড়িংপোড়া বা বাজপোড়া (হপার বার্ন) অবস্থার সৃষ্টি করে। ব্যবস্থাপনার জন্য-

১.নিয়মিতভাবে গাছের গোড়া পর্যবেক্ষণ করুন।
২. জমিতে এ পোকার সংখ্যা বাড়ার আশংকা দেখা দিলে জমে থাকা পানি সরিয়ে জমি কয়েকদিন শুকিয়ে নিন।
৩. উপদ্রুত এলাকায় ধানের চারা ঘন করে না লাগিয়ে ২০ x ২৫ সেন্টিমিটার দূরে দূরে লাগান।
৪. অধিকাংশ গাছে ৪টি গর্ভবতী বা ১০টি বাচ্চা পোকা দেখা দিলে উপযুক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করুন । কীটনাশক অবশ্যই গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করতে হবে।

 

সাদাপিঠ গাছফড়িং (White-backed planthopper) 
পূর্ণবয়স্ক পোকা ও বাচ্চা উভয় অবস্থায় সাদা-পিঠ গাছফড়িং ধান গাছের গোড়ায় বসে রস শুষে খায়। সংখ্যা বেশী হলে গাছের উপরের অংশেও এদের দেখতে পাওয়া যায়। এ পোকার আক্রমণেও ক্ষেতে ফড়িংপোড়া বা বাজপোড়া (হপার বার্ন) অবস্থার সৃষ্টি করে। ব্যবস্থাপনার জন্য বাদামি গাছফড়িংয়ের মতো একই ব্যবস্থা নিন।

 

গান্ধি পোকা (Rice bug)
পূর্ণবয়স্ক পোকা ও বাচ্চা উভয় অবস্থায় ধানের দানা আক্রমণ করে। ধানের দানায় দুধ সৃষ্টির সময় আক্রমণ হলে ধান চিটা হয়। বাচ্চা ও পূর্ণবয়স্ক গান্ধি পোকার গা থেকে বিশ্রী গন্ধ বের হয়। ব্যবস্থাপনার জন্য-

১. আলোক ফাঁদের সাহায্য নিন।
২.প্রতি গোছায় ২-৩টি গান্ধি পোকা দেখা গেলে উপযুক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করুন । কীটনাশক বিকেল বেলায় প্রয়োগ করতে হবে।

Tags:

0 Comments

Leave a Comment

আমাদের অনুসরণ করুন

GOOGLE PLUS

INSTAGRAM

LINKEDIN

YOUTUBE

বিজ্ঞাপন দিন

সাম্প্রতিকজনপ্রিয়ট্যাগ

বিজ্ঞাপন দিন

লগ ইন/সাইন আপ

Advertisement

error: Content is protected !!